ইতিহাস

 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিকথা

বিশ্বের সবচেয়ে  বৃহৎ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলা এবং বাঙ্গালীর ছয় দশকের সংগ্রাম সপ্ন এবং সাহসের সারথী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের গর্বিত অংশিদার এই ছাত্র সংগঠনটি। জাতির ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। বাঙ্গালী জাতি হিসেবে জন্ম গ্রহনের আতুর ঘর থেকে শুরু করে আজ অবধি স্বাধীনতা, সংগ্রাম আর শিক্ষার নিশ্চয়তার ছাত্রসমাজের তথা দেশবাসীর জন্য অতন্প প্রহরী ছাত্রলীগ।

বৃটিশ উপনিবেশ থেকে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের সময় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কলকাতা ইসলামীয়া কলেজের ছাত্র। তিনি ছিলেন কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক। বৃটিশ উপনিবেশ থেকে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের পর বাঙ্গালীরা নতুন ভাবে শোষনের যাতাকলে পড়ে। যাকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ''এক শকুনির হাত থেকে অন্য শকুনির হাত বদল মাত্র ''। তাই নতুন রাষ্ট্র পাকিস্থানের সরকার প্রথমে আঘাত হানে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার উপর। শেখ মুজিব তখনই অনুভব করলেন শোষনের কালো দাঁত ভাঙ্গার একমাত্র হাতিয়ার ছাত্র সমাজ। তাই তৎকালিন পাকিস্থান সরকার কতৃক চাপিয়ে দেওয়া উর্দূ ভাষার বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ তৈরির জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালিন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতা সম্পম্ন ছাত্র নেতা বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবল্পব্দু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন 'পাকিস্থান ছাত্রলীগ'।বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু। প্রথমে এর নাম ছিলো 'পাকিস্থান ছাত্রলীগ'। সংগঠনটির প্রথম আহবায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দিন আহমেদ। ছাত্রলীগ সাংগঠনিক ভাবে কার্যত্রক্রম শুরু করলে এর সভাপতি মনোনিত হন দবিরুল ইসলাম ও সাধারন সম্পাদক মনোনিত হন খালেক নেওয়াজ খান। ৬৪ বছর পর আজ এই বৃহৎ,ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটির তিন তারকা খচিত শিৰা শানস্নি ও প্রগতির গৌরবের পতাকা সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারন সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের হাতে।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার এক বছর পর ১৯৪৯ সালে এই ছাত্র সংগঠনটির হাত ধরেই তৎকালীন পাকিস্থানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে 'আওয়ামী মুসলিম লীগে'র। যা পরে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে এ দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। তৎকালিন পাকিস্থান সরকারের শাসন শোষন আর বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জন্মের পর থেকে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জাতীয় রাজনীতিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবল্পব্দু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতা কর্মী যুদব্দের ময়দানে জীবন উৎসর্গ করেছেন। রনাঙ্গনে শহীদ হয়েছেন ছাত্রলীগের ১৭ হাজার সাহসী বীর সৈনিক। বর্তমান জাতীয় রাজনীতির অনেক শীর্ষ নেতার রাজনীতিতে হাতেখড়িও ছাত্রলীগ থেকেই। ১৯৪৮ সালেই মাতৃভাষার পক্ষে ছাত্রলীগ আপোষহীন অবস্থান তৈরি করে। ১১ মার্চ ছাত্রলীগ উদর্ুর বিপক্ষে অবস্ট্থান নিয়ে ধর্মঘট পালন করে।ওই ধর্মঘটের পিকেটিং থেকেই গ্রেফতার হন রাজনীতির মাঠের জ্জ্বলজ্জ্বল করে থাকা তারকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র, বাঙ্গালীর রাজনীতির রাখাল রাজা,ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ও তার সহযোগীরা। ছাত্রলীগই প্রথম বাংলাভাষার জন্য ১০ দফা দাবিনামা পেশ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অবিস্মরনীয়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় নিশান উড়ানোর নেপথ্যের কারিগরও ছিলো ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ১৯৫৬ সালের বাংলা রাষদ্ব্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়,৫৭'র শিক্ষক ধর্মঘট এবং ৬২'র শিক্ষা আন্দোলনের পালে সমিরন প্রবাহ করে ছাত্রলীগ। ১৯৬৬ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ২০ ফেব্রুয়ারী ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রচলন হয় বাংলা সপ্টস্নাহের। বাঙ্গালীর মুক্তির ছয় দফা হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক 'ছয় দফা' আন্দোলনে রাজপথের প্রথম সারিতে অবস্ট্থান ছিল ছাত্রলীগের। এসময় নিজেদের ১১ দফার মাধ্যমে ছাত্রসমাজের রক্তে প্রবাহ সঞ্চার করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই আগরতলা ষড়যন্প মামলা ছাত্র-গণ আন্দোলন থেকে গণঅভু্যত্থানে রূপ নেয়। গণজাগরনের ৭০'র নির্বাচনে মুক্তির সনদ ছয় দফাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এক দফার গণভোটে রূপ দেয়। এরপর ৭১'র ত্রিশ লাখ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলার আকাশে যে রক্ত স্নাত লাল সূর্যোদয় হয় তাতে পরিসংখ্যানের হিসেবে বিশ্বের বৃহৎ. ও সংগ্রামী সংগঠন ছাত্রলীগের আত্মত্যাগী নেতাকর্মীদের সংখ্যা ছিল ১৭০০০ (সতের হাজার)।

১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ কালপূর্বে যুদব্দবিধ্বস্ট্থ দেশ গঠনের সংগ্রাম ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো অগ্রগন্য। ১৯৭৫ সারে জাতির পিতা ও তার পরিবারে সদস্যদের নির্মম ভাবে হত্যার পর বাঙ্গালীর জাতির ভাগ্যকালে আবার কালো গ্রাস করে নেয়। স্টৈ্বরশাসক মেজর জিয়া ও তৎপরবর্তী রাজনীতির মাঠে সামরিক চাষবাসের তিক্ত ফসল বাঙ্গালীদের অতিষ্ঠ করে তোলে। যা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে রাজপথে রক্তা দিতে হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। সামরিক শাসনের মধ্যেও ১৯৮৩ সালে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফা তৈরিতে নেতৃত্দ্ব দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শিক্ষার অধিকার প্রসারে শামসুল হক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরির কমিশনে রিপোর্ট তৈরিতে ছাত্রসমাজের পক্ষে জোড়ালো অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ।

এরপর একটি সফল গণঅভূত্থান পরবর্তী নির্বাচনে দীর্ঘ একুশ বছর পর সরকার গঠন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ছাত্রলীগ মহিয়সী নেত্রী, দেশরত্দম্ন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক নির্দেশ প্রতিপালন করেছে। ১৯৯৮ সালের বন্যা মোকাবেলায় কিছু অদহৃরদর্শী ব্যক্তির দুর্ভিক্ষের আশংকাকে ভুল প্রমান করেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তিন শিফটে রুটি তৈরি করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। তৈরী করেছে দুর্যোগপুর্ন এলাকার মানুষের জন্য খাবার স্যালাইন। দুসময়ে দুর্গত এলাকায় রুটি ও স্যালাইন বিতরন করে মানুষের জীবন রক্ষা করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। যার মাধ্যমে হতাশা ও প্রজ্ঞাহীন ব্যক্তিদের আশংকার জবাব দিয়েছে ছাত্রলীগ। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন বৃদব্দির প্রতিবাদী আন্দোলনে ছাত্রলীগ ছিল আপোসহীন। নিরক্ষরতা মুক্ত,পোলিও মুক্ত বাংলাদেশ বির্নিমান ও বৃক্ষরোপনের মধ্যেমে বিশ্বের উষষ্ণায়ন কমাতে প্রতিটি জেলায় জেলায় কাজ করেছে ছাত্রলীগ। ২০০১ লর নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি জামায়ত জোটের সহিংসতা এবং দেশব্যাপী সাংগঠনিক নির্যাতনের বিরুদব্দে ছাত্রলীগ প্রতিরোধ রচনা করেছে। পাক আত্দ্মানির্ভর বিএনপি জামায় জোটের হাতে এদেশের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃতির বিরুদব্দেও জোড়ালো প্রতিবাদ করেছে ছাত্রলীগ। ২০০১ সালের পর বিএনপি জামায়াত জোটের প্রত্যক্ষ মদদে শনস্নির এই ভূখন্ডে জঙ্গীবাদরে উত্থান হলে ছাত্রলীগ তার বিরুদব্দে রাজপথে কঠোর প্রতিবাদ রচনা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় অধ্যাপক ড.হুমায়ুন আজাদের উপর মৌলবাদি হামলার প্রতিবাদেও রাজপথে ছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগষদ্ব রাষদ্ব্রিয় মদদে স্ট্বরন কালের সবচেয়ে পৈচাশিক গ্রেনেট হামলার মাধ্যমে বাংলার মানুষের চির আস্ট্থার ঠিকানা আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার জীবন নাশের হামালা জোড়ালো প্রতিবাদ জানায় ছাত্রলীগ। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই আমাদের প্রিয় নেত্রী বাংলার দু:খি মানুষের একমাত্র আস্ট্থার ঠিকানা দেশরত্দম্ন শেখ হাসিনাকে তথাকথিত তত্ত্বাবোধায়ক সরকারের নামে সামরিক কায়দায় আটকের পর সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে প্রথম প্রতিবাদ রচনা করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বিতর্কীত সেই তত্ত্বাবোধায়ক সরকারের হাতে গ্রেফতার হয়ে উনিশ মাস কারাবরন করেন ছাত্রলীগের তৎকালিন সাধারন সম্পাদক সহ অনেক জেষ্ঠ্য নেতা । তবুও প্রাণাধিক প্রিয় নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন থেকে ছাত্রলীগকে পশ্চাতে হঠাতে পারেনি শাসক শ্রেনী। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘট পালন করে ছাত্রলীগ প্রিয় নেত্রীর মুক্তির অদম্য আন্দোলন রচনা করে। এরপর ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেল্ফ্বরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্দ্বাধীন মহাজোটের বিজয় নিশ্চত করতে নিরলস ভাবে কাজ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটি মুজিব সৈনিক। এরপর পর বাংলাদেশের সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগের নেতৃত্দ্বাধীন মহাযোজ। দেশে জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্দ্বে শুরু হয় দিন বদলের সরকারের পথ চলা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন কমিশনের নিবল্পব্দনের শর্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক সভানেত্রীর পদ থেকে হারাতে হয় আমাদের প্রিয় নেত্রীকে। এরপর ২০১১ সারের ১১ জুলাই গণতন্পের মানসকন্যা গনতন্পপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমানের জন্য মেধাবী ও প্রজ্ঞাও দহৃরদর্শীতা সমঙ্ল্পম্ন ছাত্রনেতাদের হাতে ছাত্ররাজনীতি তুলে দিতে ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচন করা হয় প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে। সাবার দেশের ৮৭টি সাংগঠনিক জেলার কাউন্সিলররা তাদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সিদ্দিকী নাজমুল আলমকে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করেন।

২০০১ সাল পরবর্তী সময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর হাতে দেশ জিম্মি থাকার প্রেক্ষাপটে ২০০৫ সালের ৭ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করেছিল সাতটি ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ),বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় ছাত্র ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি ও জাতীয় ছাত্র ফোরাম সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। বর্তমানে এই যুদব্দাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রাজপথে আন্দোলনে করে যাচ্ছে সল্ফ্মিলিত ভাবে যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

Collection:  Md. Asif Razzak Joy
                  BBS (pass)
                  Govt. City College Ctg


__________________________________________________________________________________



রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এর ভাষণ

আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সেপাই, সৈনিক, জনগণকে, হিন্দু-মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমি আপনাদের কাছে দু-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমার বাংলা স্বাধীন থাকবে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারব না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মেয়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী তারা সংগ্রাম করেছে, আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসির কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে কেউ দাবায় রাখতে পারবে না। আমার বাংলার মানুষ স্বাধীন হবেই। আমি আমার যেই ভায়েরা যারা আত্মাহুতি দিয়েছে, শহীদ হয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আজ প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দেয়া হয়েছে বাংলার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও এবং প্রথম মহাযুদ্ধেও এত লোক, এত সাধারণ নাগরিক মৃত্যুবরণ করে নাই, শহীদ হয় নাই। যা আমার এই সাত কোটির বাংলাদেশে হয়েছে। আমি জানতাম না আপনাদের কাছে আমি ফিরে আসব। তাই খালি একটা কথা বলেছিলাম। তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও আমার আপত্তি নাই। মৃত্যুর পর আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিও। এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধিকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনসাধারণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের সামরিক বাহিনীকে। আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়ার জনসাধারণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ব্রিটিশ, জার্মানি, ফ্রান্স সব জায়গায় যে গভর্নমেন্ট জনসাধারণ আছে, তাদের আমি মোবারকবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন করেছে। আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই দুনিয়ার মজলুম জনসাধারণকে যারা আমার এই মুক্তিসংগ্রামকে সাহায্য করেছে। আমার বলতে হয়, এক কোটি লোক এই বাংলাদেশের থেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের জনসাধারণ, মিসেস ইন্দিরা গান্ধি তাদের খাবার দিয়েছে। তাদেরকে মোবারকবাদ জানাতে পারি নাই। যারা অন্যরা সাহায্য করেছে তাদেরকেও মোবারকবাদ দিতে হয়।
তবে মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে। বাংলাদেশকে কেউ দাবাতে পারবে না। বাংলার মধ্যে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। আমি বলেছিলাম যাবার আগেও, বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, তোমরা তা করেছো। আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করেছো। আমি আমার সহকর্মীদের মোবারকবাদ জানাই। আমার বহু ভাই, আমার বহু কর্মী, আমার বহু মা-বোন, আমার বহু ভাই আজ দুনিয়ায় নাই। তাদের আমি দেখব না। আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়া অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই। আমার সোনার বাংলা তোমায় বড় ভালোবাসি। খোদা তার জন্যই আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে।
আমি আশা করি। দুনিয়ায় সমস্ত রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন যে আমার রাস্তা নাই, আমার ঘাট নাই, আমার জনগণের খাবার নাই, আমার মানুষ গৃহহারা সর্বহারা, আমার মানুষ পথের ভিখারী, তোমরা আমার মানুষকে সাহায্য কর। মানবতার খাতিরে আমি তোমাদের কাছে সাহায্য চাই। দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্রের কাছে আমি সাহায্য চাই। আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকগনাইজ কর, জাতিসংঘে স্থান দাও। দিতে হবে। উপায় নাই, দিতে হবে। আমি, আমরা হার মানব না, মিথ্যা কথা, প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি দেখিয়ে দিয়েছে, দুনিয়ার ইতিহাসে স্বাধীনতার সংগ্রামে এত লোক আত্মহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি, আমার দাবায়া রাখতে পারবা না।
আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম, ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেটভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ, কর্মীবাহিনী তোমাদের মোবারকবাদ জানাই। তোমরা গেরিলা হয়েছো, তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না। রক্ত বৃথা যায় নাই। একটা কথা, আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি-ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যে লোকেরা আছে, অন্যদেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক, বাংলায় কথা বলে না। আজও বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি, তাদের উপর হাত তুলো না। আমরা মানুষ, মানুষ ভালোবাসি। তবে যারা দালালি করেছে, যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। বিচারের দায়িত্ব বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন। একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিকের মতো স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে।আমি দেখায় দিবার চাই দুনিয়ার কাছে যে, শান্তিপ্রিয় বাঙালি রক্ত দিতে জানে, শান্তিপ্রিয় বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।
আমারে আপনারা পেয়েছেন, আমি আসছি। জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম,আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু আইসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব, আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাব না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।
ভাইয়েরা আমার যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন। আমি সমস্ত জনসাধারণকে বলতে চাই, সেখানে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে নিজেরাই রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে ধান বুনাও। সব কর্মচারীদের বলে দিবার চাই একজনও ঘুষ খাবেন না। আমি দোষ ক্ষমা করব না। ভাইয়েরা আমার। যাবার সময় যখন আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাজউদ্দিন, নজরুল এরা আমার কাছে যায়। আমি বলেছিলাম সাত কোটি বাঙালির সাথে আমাকে মরতে দে তোরা। আমি আর্শিবাদ করছি। তাজউদ্দিনরা কাঁদছিল। তোরা চলে যা, সংগ্রাম কর, আমার আত্মা রইল। আমি এই বাড়িতে মরতে চাই, এই হবে বাংলার জায়গা, এই শহরে আমি মরতে চাই। ওদের কাছে মাথা নত করতে আমরা পারব না।
ভাইয়েরা আমার, ডক্টর কামালকে নিয়ে তিন মাস পর্যন্ত সেখানে ইন্টারোগেশন হয়েছে মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও। কয়েকজন বাঙালি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে। তাদের আমরা জানি এবং চিনি। তাদের বিচার হবে। আজ আমি বক্তৃতা করতে পারছি না। আপনারা বুঝতে পারেন। নব নব নব সুন্দরী মম, জননী জন্মভূমি, গঙ্গার তীর সিক্ত সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি। আমার জীবন। আজ যখন আমি ঢাকায় নামছি, তখন আমি চোখের পানি রাখতে পারি নাই। আমি জানতাম না, যে মাটিকে আমি এক ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, যে বাংলাদেশকে আমি এত ভালোবাসি, সেই বাংলঅয় আমি যেতে পারব কিনা?
আজ আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছি, আমার ভাইদের কাছে, আমার মাদের কাছে, আমার বোনদের কাছে, বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলার মানুষ আজ আমরা স্বাধীন।
আমি পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের বলি, তোমরা সুখে থাকো। তোমাদের মধ্যে আমাদের ঘৃণা নাই। তোমাদের আমরা শ্রদ্ধা করতে চেষ্টা করব। তোমার সামরিক বাহিনীর লোকেরা যা করেছে, আমার মা-বোনের উপর রেপ করেছে। আমার ৩০ লক্ষ লোকে মেরে ফেলে দিয়েছে। যাও সুখে থাকে। তোমরা সুখে থাকো। তোমাদের সঙ্গে আর না। শেষ হয় গেছে। তোমরা স্বাধীন থাকো। আমিও স্বাধীন থাকি। তোমাদের সঙ্গে আমার স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বন্ধুত্ব হতে পারে, তাছাড়া বন্ধুত্ব হতে পারে না। তবে যারা অন্যায়ভাবে অন্যায় করেছে তাদের সম্বন্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হবে।
আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই। আর একদিন আমি বক্তৃতা করব। কিছুদিন পরে একটু সুস্থ হয়ে নেই। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন আমি সেই মুজিবুর এখন আর নাই। আমার বাংলার দিকে চাইলেই দেখেন সমান হয়ে গেছে জায়গা, গ্রাম। গ্রাম পোড়ায় দিয়েছে। এমন কোন ঘর নাই যার মধ্যে আমার লোকদের হত্যা করা হয় নাই কত বড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ মানুষকে এইভাবে হত্যা করে সামরিক বাহিনীর লোকেরা। আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী। ঘৃণা করা উচিত। জানা উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে এই বাংলাদেশই দ্বিতীয় স্থান মুসলিম কান্ট্রি। মুসলমান সংখ্যা বেশি দ্বিতীয় স্থান। আর ইন্ডিয়া তৃতীয় স্থান, আর পশ্চিম পাকিস্তান চতুর্থ স্থান। আমরা মুসলমান। মুসলমান মা-বোনদের রেপ করে!
আমরা মুসলমান। আমরা রাষ্ট্রে এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এই বাংলাদেশে হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।
যারা জানতে চান, আমি বলে দিবার চাই, আসার সময় দিল্লীতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির সংগে যেসব আলোচনা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি যে, আমি জানি তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। সে পণ্ডিত নেহেরুর কন্যা, সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তাঁরা রাজনীতি করেছেন, ত্যাগ করেছেন। তাঁরা আজকে সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। যেদিন আমি বলব, সেইদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে। এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু কিছু সরায় নিচ্ছেন। তবে যে সাহায্য করেছেন, আমি আমার সাত কোটি দুঃখী বাঙালির পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধিরা গান্ধিকে, তাঁর সরকারকে, ভারতের জনসাধারণকে, মোবারকবাদ জানাই। অন্তরের অন্তস্থল থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। ব্যক্তিগতভাবে এমন কোন রাষ্ট্রপ্রধান নাই যার কাছে তিনি আপিল করেন নাই যে শেখ মুজিবকে ছেড়ে দাও। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রের কাছে বলেছেন, তোমরা ইয়াহিয়া খানকে বল শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। একটা রাজনৈতিক সলিউশন করার জন্য।
এক কোটি লোক মাতৃভূমি ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে গেছে। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে লোকসংখ্যা ১০ লাখ, ১৫ লাখ, ২০ লাখ, ৩০ লাখ, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ। শতকরা ৬০টা রাষ্ট্র আছে যার জনসংখ্যা এক কোটির কম। আর আমার বাংলা থেকে এক কোটি লোক মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতে স্থান নিয়েছিল। কত সেখানে অসুস্থ অবস্থায় মারা গেছে। কত না খেয়ে, না খেয়ে কষ্ট পেয়েছে।
কত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই পাষণ্ডের দল। ক্ষমা কর আমার ভাইয়েরা ক্ষমা কর। আজ আমার কারও বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নেই। একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলোনা। অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দেব। আইন-শৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না।
মুক্তিবাহিনীর যুবকরা, তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর। ছাত্রসমাজ, তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর। শ্রমিক সমাজ, তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর। কৃষক সমাজ, তোমরা আমার সালাম গ্রহণ কর। বাংলার হতভাগ্য হিন্দু-মুসলাম আমার সালাম গ্রহণ কর। আর আমার যে কর্মচারীরা, যে পুলিশ, যে ইপিআর, যাদের উপর মেশিনগান চালিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা মা-বোন ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে। তার স্ত্রীদেরকে গ্রেফতার করে কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তোমাদের সকলকে আমি সালাম জানাই, তোমাদের সকলকে আমি শ্রদ্ধা জানাই।
নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, বাংলায় মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে, এই আমার জীবনের সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এই দেশে এই চিন্তা করেই মরতে পারি। এই দোয়া এই আশির্বাদ আপনারা আমাকে করবেন। এই কথা বলে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবার চাই। আমার সহকর্মীদের সকলকে আমি ধন্যবাদ জানাই, যারা আমার, তারা একজন একজন করে তা প্রমাণ করে দিয়েছে যে না মুজিব ভাই বলে গেছে তোমরা সংগ্রাম কর, তোমরা স্বাধীন কর, তোমরা জান দাও, বাংলার মানুষকে মুক্ত কর, আমার জন্য চিন্তা কর না, আমি চললাম, যদি ফিরে আসি আমি জানি ফিরে আসতে পারবো না, কিন্তু আল্লাহ আছে, তাই আজ আমি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। তোমাদের আমি, আমার সহকর্মীরা, তোমাদের আমি মোবারকবাদ জানাই। আমি জানি কি কষ্ট তোমরা করেছে। আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, নয় মাস পর্যন্ত আমাকে কাগজ দেয়া হয় নাই।
এ কথা সত্য, যাবার আসার সময় ভুট্টো সাহেব আমাকে বলেছিলেন, শেখ সাহেব চেষ্টা করেন দুই অংশের কোন একটা বাঁধন দেয়া যায় কি না। আমি বললাম আমি কিছু বলতে পারি না, আমি কোথায় আছি জানি না। আমার বাংলা, আমার মাটিতে যেয়ে আমি বলব। আজ বলছি ভুট্টো সাহেব, সুখে থাকো। বাঁধন ছুটে গেছে। তুমি যদি কোন বিশেষ শক্তির সঙ্গে গোপন পরামর্শ করে আমার বাংলা স্বাধীনতা হরণ করতে চাও, এবার মনে রেখ, এবার তাদের নেতৃত্ব দেবে শেখ মুজিবুর রহমান। মরে যাবো, স্বাধীনতা হারাতে ছাড় দেব না। ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পশ্চিম পাকিস্তানে। আমি অনুরোধ করব তাদের, একটা জিনিস আমি বলতে চাই, তোমাদের এপ্রুভাল নিয়ে আমার সহকর্মীরা, এন্টারন্যাশনাল ফোরামে জানিসংঘের তত্ত্বাবধায়ক, অথবা ওয়াল্ড জুরিসডিকশনের পক্ষ থেকে একটা ইনকোয়ারি হতে হবে। যে কি পাশবিক অত্যাচার, কিভাবে হত্যা করেছে আমাদের লোকদের, এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানাতে হবে। আমি দাবি করব জাতিসংঘকে হিউম্যান রাইটসকে, বাংলাদেশকে আসন দাও এবং একটি ইনকোয়ারি কর।
ভাইয়েরা আমার, যদি কেউ চেষ্টা করেন ভুল করবেন। আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই। সাবধান বাঙালিরা ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই। একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি কর। বলেছিলাম, বলেছিলাম যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধ কর। বলেছিলাম? বলেছিলাম এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এই জায়গায় ৭ই মার্চ তারিখে। আজ বলে যাচ্ছি তোমরা ঠিক থাকো, একতাবদ্ধ থাকো। কারও কথা শুনো না। ইনশাআল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি, স্বাধীন থাকব। একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে কেউ আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবেন না।
আজ আমি আর বক্তৃতা করতে পারছি না। একটু সুস্থ হলে আবার বক্তৃতা করব। আপনারা আমারে মাফ করে দেন। আপনারা আমারে দোয়া করেন। আপনারা আমারে দোয়া করেন। আপনারা আমার সাথে সকলে আজকে একটা মোনাজাত করেন আল্লাহুমা আমিন।



Collection:  Md. Asif Razzak Joy
                 BBS (pass)
                 Govt. City College Ctg

No comments:

Post a Comment